Tuesday, April 9, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-১১

গীতার স্থান, কাল ও পাত্র । পর্ব-৮
ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত ............।।
শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতায় পার্থসারথি কে ? শ্রী গীতা ইহার পরিচয় কতদূর দিবেন, আমরা এখানে তাহার আলোচনা অসঙ্গত মনে করি না ।
গীতা শাস্রে "ভগবান্‌ উবাচ" এই কথায় শ্রীকৃষ্ণকেই যে লক্ষ্য করা হইয়াছে, তাহাতে কাহারও কোন সন্দেহ নাই । এই শ্রীকৃষ্ণ যে অবতার, ইনি যে মায়া-মানুষ, ইনিই যে ধর্ম্মের গ্লানি এবং অধর্ম্মের অভ্যুত্থান হইলে অবতীর্ণ  হইয়া সাধুদিগের পরিত্রাণ এবং অসাধুদিগের বিনাশ সাধন করিয়া যুগে যুগে ধর্ম্ম সংস্থাপন করেন, তাহাও গীতাশাস্রে পাওয়া যায় ।
"শ্রীভগবানুবাচ"-তে পাওয়া যায়-
অজোহপি সন্নব্যইয়াত্মা ভুতানামীশ্বরোহপি সন্‌ ।
প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবামায়াত্মায়য়া ।।৪-৬
এই শ্রীভগবান্‌ শ্রীকৃষ্ণই অজ- জন্মরহিত ; ইনিই আবার ভূতসমূহের ঈশ্বর; ইনি আপনার প্রকৃতিতে অধিষ্ঠান করিয়া আত্মমায়া দ্বারা জন্মগ্রহণ করেন ।
এই শ্লোকে পাওয়া যাইতেছে,- যাঁহার জন্ম নাই, যিনি অব্যয় আত্মা, যিনি প্রাণীসমূহের ঈশ্বর, তিনিই তাঁহার প্রকৃতিতে অধিষ্ঠান করেন এবং আত্মমায়া প্রভাবে শ্রীকৃষ্ণরূপে জন্মগ্রহণ করেন ।
আমরা এখন জিজ্ঞাসা করি, যাঁহার জন্ম নাই, যিনি অজ, তিনি কোন্‌ বস্তু  ?
শ্রীমদ্ভাগবদ্‌গীতাতে জীবের আত্মাকেও অজ বলা হইয়াছে । এই জীবাত্মাই অবিনাশী, ইনিই অব্যয়, শরীরের বিনাশে ইহার বিনাশ হয় না ।
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচি-
ন্নায়ং ভুত্বা ভবিতা বা ন ভুয়ং ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হস্যতে হন্যমানে শরীরে ।।
জীবের আত্মা যিনি, তিনি কোন কালে জন্মেনও না, মরেনও না । ইনি হইয়া আবার যান, ইহাও নহে; অথবা না হইয়া আবার হন তাহাও নহে । হইয়া -জাত হইয়া তিরোভূত হওয়াকে লোকে মরিল বলিয়া বলে (আবার 'অভূত্বা'-না হইয়া 'ভবিতা'-হয়াকে লোকে জন্মান বলে) তাই বলা হইল আত্মার জনন মরণ নাই ; ইনি অজ ; এনি নিত্য-সর্ব্বদা একরূপ, ইনি শাশ্বত-সর্ব্বদা বর্ত্তমান ; ইনি পুরাণ-পুরা হইয়াও নব-সর্ব্বদা নতুন, অপুর্ব্ব ; শরীর হনন করিলেও ইনি হত হয়েন না ।
যিনি অজ, যিনি আব্যয়, তাঁহার সম্বন্ধেই পুনরায় বলা হইতেছে-শস্র ইহাকে কাটিতে পারে না, অগ্নি পোড়াইতে পারে না, জল ইহাকে পচাইতে পারে না, বায়ু ইহাকে শুষ্ক করিতে পারে না । ইনি আচ্ছেদ্য ; ইনি আদাহ্য ; ইনি অশোষ্য ; ইনি নিত্য, সর্ব্বব্যাপী, স্থিরস্বভাব ; ইনি চিরদিন আছেন ; ইনি ইন্দ্রিয়ের অগ্রাহ্য, চিন্তার অগোচর ; ইনি ষড়্‌ বিধ-বিকার-শূন্য ।
লক্ষ্য রাখিতে হইবে জীবাত্মাকে সর্ব্বগত-সর্ব্বব্যাপী বলা হইল ।  জীবাত্মা যেমন অজ, অব্যয়, অবিনাশী, সর্ব্বব্যাপী, পরমাত্মাও সেইরুপ । গীতা তবে দেখাইতেছেন-যিনি জীবাত্মা, তিনিই পরমাত্মা ! নতুবা উভয়েরই সর্ব্বগতত্ব, সর্ব্বব্যাপিত্ব বিশেষণ কেন দিবেন ? যিনি সর্ব্ববাব্যাপী, তিনি একই ; তিনি পূর্ণই । জীবাত্মাও পূর্ণ, আবার পরমাত্মাও পূর্ণ ; তবে জীবাত্মা ও পরমাত্মার প্রভেদ কি রহিল ? ফলে, শ্রুতি যেমন জীবাত্মাও পরমাত্মার প্রভেদ করেন না, শ্রুতি যেমন বলেন,- উপাধিগত পার্থক্য থাকিলেও বস্তুটি এক, আকাশ এক হইলেও ঘট-পটের পার্থক্য আছে বলিয়া এক আকাশকেই ঘটাকাশ, প্টাকাশ প্রভৃতি বহু নামে অভিহিত করা হয় মাত্র' সেইরুপ শ্রীগীতাও বলিতেছেন,-'আত্মা একটি হইলেও ইহাকেই কখনও বলা হয় ব্রক্ষ, কখনও ঈশ্বর, কখন জীব- এই ভিন্ন ভিন্ন  নাম রূপে নির্দ্দেশ কারা হয় ।' যাঁহারা গীতাশাস্র একটু মনোযোগের সহিত আলোচনা করিবেন, তাঁহারাই এ কথা সত্য বলিয়া বুঝিবেন । সেইজন্যই গীতাকে "অদ্বৈতামৃতবধিণী" বলা হইয়াছে ।

Sunday, April 7, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-১০

গীতার স্থান, কাল ও পাত্র । পর্ব-৭
ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত  ............।।

অর্জুন-বলিতেছেন-
ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ম্‌ কৃষ্ণ ন চ রাজ্যম্‌ সুখানি চ ।
কিম্‌ ন রাজ্যম্‌ গোবিন্দ কিম্‌ ভোগৈঃ জীবিতেন বা ।।"
কৃষ্ণ ! আমি রাজ্যও চাহিনা, ভোগও চাহি না, জীবনেও আমার প্রয়োজন নাই । অর্জ্জুন মহাপুরুষ । মহাপুরুষও সাধারণের মত কাতরোক্তি করেন- সাধারণে আশান্বিত হয়, অর্জ্জুনকে আপনাদের মত মনে করে । তথাপি অর্জ্জুনের সহিত সাধারণের কোন বিশেষ সাদৃশ্য নাই । অর্জ্জুন মহাপুরুষ, তাহারা কাপুরুষ । জীবন-সংগ্রামে ভীত হইয়া লোকে শতবার বলে "আর পারি না" মৃত্যু হইলেই ভাল হয়" । অর্জ্জুন কিন্তু 'পারি না' বলিতেছেন না, বলিতেছেন 'যুদ্ধ করিব না' কারণ যুদ্ধ করা নিষ্ঠুরের কার্য্য, আমি নিষ্ঠুর হইতে চাহি না । ক্লেশের চয়ে বা প্রাণের ভয়ে কিন্তু অর্জ্জুন যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত হইতেছেন না, হইতেছেন করুণায়-পাছে অপরের জীবন নষ্ট হয় এই জন্য-কিরুপে গুরুকে শরদ্বারা বিদ্ধ করিবেন, কিরুপে পিতামহকে অস্রাঘাত করিবেন, এই জন্য । ভীষ্ম ও দ্রোণের কথা অর্জ্জুন একধিক বার উল্লেখ করিয়াছেন । যে পিতামহের ক্রোড়েদেশে উপবেশন করিয়া পিতৃ'হান বালক পিতামহকে 'পিতা' বলিয়া সম্বোধন করিত, আর ভীষ্ম সজলনয়নে বালকের ভ্রম সংশোধন করিয়া দিতেন, আজ যাঁহাকে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করিতে ইচ্ছা করে, তাঁহাকে বিনাশ করিব কিরুপে ? অর্জ্জুন এই জন্য শোক কাতর । যে আচার্য্য অর্জ্জুনকে সর্ব্বপ্রধান করিবার জন্য অশ্বথামাকেও গোপন করিয়া অস্রশিক্ষা দিয়াছিলেন-যে আচার্য্য অর্জুনের প্রতিদ্বন্দ্বী কেহ না থাকে, এই জন্য একলব্যের নিকটে বৃদ্ধাঙ্গুলি গুরু-দক্ষিণা গ্রহণ করিয়াছিলেন, সেই গুরুকে প্রাণে বিনাশ করিতে হইবে-অর্জ্জুন কৃপা-পরবশ হইয়া যুদ্ধ হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইতেছেন । তুমি কি এই কৃপাবেশে আবিষ্ট হইয়া কর্ম্ম করিয়া থাক ? তুমি কি মনে ভাব-এই ধন গ্রহণ করিবে না, তুমি গ্রহণ করিলে অপর প্রতিদ্বন্দ্বীতায় মনঃপীড়া হইবে, অতএব গ্রহণ করা উচিত নহে-ইহা কি লোকের উক্তি ? তাই বলিতেছিলাম কিছু পার্থক্য আছে । অর্জ্জুনের বিষাদ আস্বাভাবিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করিবার জন্য বন্ধুবিনাশ প্রভৃতি হইতে উৎপন্ন হয় নাই, এ বিষাদের মূলে পাপ নাই, আছে গুরু বা আচার্য্য বিনাশভয় ! যাহা হউক এই বিশ্ববিজয়ী মহাপুরুষ আজ যুদ্ধাস্ত্র ত্যাগ করিয়া দীনভাবে দণ্ডায়মান । যাঁহার সব্যসাচিত্বে দেবাসুরে কেহই তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী হইতে সাহস পাইত না, যিনি শৌর্য্যে সুরোন্মাদিনী উর্ব্বশীকেও তুচ্ছ করিয়াছিলেন, এই শূর- এই বীর আজ অস্র নিক্ষেপ উদ্যত হইয়া আর অস্র নিক্ষেপ করিলেন না, অস্র পরিত্যাগ করিয়া কাতরে ঘোড়-করে দাঁড়াইয়াছেন ; এই লোকক্ষয়কর সমর প্রারম্ভে তাঁহার হৃদয় করুণায় পূর্ণ হইয়াছে ; যুদ্ধ ত্যাগ করিয়া আজ তিনি ভিক্ষাবৃত্তিগ্রহণে প্রস্তুত হইয়াছেন; আর সর্ব্ব-লোক-মহেশ্বর, ভক্ত-তরণীর কর্ণধার, দীনের বন্ধু, তাপিতের আশ্রয়, বিপন্নের মধুসুদন, এই কাতর জনের রথে সারথি ।

Friday, April 5, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-৯

 * দ্বিতীয় কথা *
 -গীতার স্থান, কাল ও পাত্র - পর্ব-৬

ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত ............।।
যেখানে অর্জ্জুন দুঃখ করিতেছিলেন-আত্মীয়স্বজন মরিবে, সেইখানে ভগবান্‌ কোন প্রকার দুর্ব্বলতার উপদেশ দিলেন না । যাহা সত্য তাহাই বলিলেন । বলিলেন তুমি পন্দিতের মত কথা কহিতেছ কিন্তু মূর্খের মত কার্য্য করিতেছ । তুমি অশোচ্য বিষয়ে শোক করিতেছ । ভীষ্ম দ্রোণাদীর দেহগুলিই কিছু ভেষ্ম দ্রোণ নহে । ইহাদের আত্মাই ইহারা । কিন্তু 'আত্মার মৃত্যু নাই; । এই সমস্ত ব্যক্তির "আত্মা"আজয় আমর । ইহাঁরা আত্মা নহে ইহাঁরা দেহ এই দেহাত্মবোধ তুমি কেন করিতেছ ? তোমর জানা উচিত আত্মা-    
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ, নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ।।
জীবের আত্মা শরীর নষ্ট হইলেও মরে না । এই আত্মার জন্ম নাই, মৃত্যু নাই । বালক যোদ্ধা প্রসিদ্ধ বীরপুরুষদিগের নিকট অস্রপরীক্ষা দিতে গিয়া যেরূপ কম্পিত হয়, বালক নক্তা জগন্মান্য পণ্ডিতমন্ডলী-মধ্যে প্রথম মুখ খুলিবার সময় যেরূপ ঘর্ম্মাক্ত-কলেবর হয়, শুষ্ক-মুখে আপন হৃদয়ে যেরূপ গুরুতর ঘাতপ্রতিঘাত উপলব্ধি করে, অর্জ্জুনের ততোধিক হইতেছে, অথচ অর্জ্জুন বিশ্ববিজয়ী মহাপুরুষ । কিরাতরুপী ভগবান্‌ পিনাকপাণি এই অর্জ্জুনের পরাক্রমে পরিতুষ্ট হইয়া বলিয়াছিলেন-
ভো ভো ফল্গুন ! তুষ্টোহস্মি কর্ম্মণাহপ্রতিমেন তে ।
শৌর্য্যেণানেন ধৃত্যা চ ক্ষত্রিয়ো নাস্তি তে সমঃ ।।
হে অর্জ্জুন ! তোমার কর্ম্মে বড়ই তুষ্ট হইলাম, ধৃতি ও শৌর্য্য তোমার মত ক্ষত্রিয় আর নাই । যখন কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের অব্যবহিতপুর্ব্বে এই অর্জ্জুন বিরাট রাজকুমার উত্তরের সারথ্য করিয়াছিলেন, যখন উত্তর ভীত হইয়া ক্লীব বৃহন্নলার ভীতি উৎপাদন জন্য পুনঃ পুনঃ কৌরবসৈন্য দেখাইতেছিলেন, পুনঃ পুঃ ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, শল্যাদি কুরিবীরগণের নামোল্লেখ করিতেছিলেন, আর বলিতেছিলেন-তুমি একাকী, কিরুপে এই প্রবল-পরাক্রম মহারথগণের সহিত যুদ্ধ করিবে, তখন যে অর্জ্জুন সগর্ব্বে বিরাট-পুত্রকে উত্তর করিয়াছিলেন-'উত্তর ! যখন দ্রৌপদী-স্বয়ংবরে লক্ষাধিক নরপতি আমায় আক্রমণ করিয়াছিল, তখন আমি একা-কে তখন আমায় সহায় হইয়াছিল ? যখন কালান্তক যমতুল্য অগণিত নিবাতকবচগণের সহিত আমি যুদ্ধ করিয়াছিলাম, কে তখন আমায় সাহায্যার্থ আসিয়াছিল ?' যে অর্জ্জুন ঐ সময়ে উত্তরকে সারথি করিয়া বহুবার ভীষ্ম দ্রোণাদি মহারথগণকে পরাস্ত করিয়াছিলেন, দুর্য্যোধনাদির প্রাণসংহার সমর্থ হইয়াও যিনি সন্মোহন-অস্রে কৌরব-শত্রুদিগকে মূচ্ছিত মাত্র করিয়াছিলেন, প্রাণসংহার করেন নাই, সেই অর্জ্জুন আজ বলিতেছেন-
"ন চ শক্লোমি অবস্থাতুম্‌ ভ্রমতী ইব চ মে মনঃ ।"
হে কৃষ্ণ ! হে অচ্যুত ! আমি আর অবস্থান করিতে পারিতেছি না, আমার মস্তক ঘুর্ণিত হইতেছে-
  চলবে........................................................................।