Sunday, April 7, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-১০

গীতার স্থান, কাল ও পাত্র । পর্ব-৭
ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত  ............।।

অর্জুন-বলিতেছেন-
ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ম্‌ কৃষ্ণ ন চ রাজ্যম্‌ সুখানি চ ।
কিম্‌ ন রাজ্যম্‌ গোবিন্দ কিম্‌ ভোগৈঃ জীবিতেন বা ।।"
কৃষ্ণ ! আমি রাজ্যও চাহিনা, ভোগও চাহি না, জীবনেও আমার প্রয়োজন নাই । অর্জ্জুন মহাপুরুষ । মহাপুরুষও সাধারণের মত কাতরোক্তি করেন- সাধারণে আশান্বিত হয়, অর্জ্জুনকে আপনাদের মত মনে করে । তথাপি অর্জ্জুনের সহিত সাধারণের কোন বিশেষ সাদৃশ্য নাই । অর্জ্জুন মহাপুরুষ, তাহারা কাপুরুষ । জীবন-সংগ্রামে ভীত হইয়া লোকে শতবার বলে "আর পারি না" মৃত্যু হইলেই ভাল হয়" । অর্জ্জুন কিন্তু 'পারি না' বলিতেছেন না, বলিতেছেন 'যুদ্ধ করিব না' কারণ যুদ্ধ করা নিষ্ঠুরের কার্য্য, আমি নিষ্ঠুর হইতে চাহি না । ক্লেশের চয়ে বা প্রাণের ভয়ে কিন্তু অর্জ্জুন যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত হইতেছেন না, হইতেছেন করুণায়-পাছে অপরের জীবন নষ্ট হয় এই জন্য-কিরুপে গুরুকে শরদ্বারা বিদ্ধ করিবেন, কিরুপে পিতামহকে অস্রাঘাত করিবেন, এই জন্য । ভীষ্ম ও দ্রোণের কথা অর্জ্জুন একধিক বার উল্লেখ করিয়াছেন । যে পিতামহের ক্রোড়েদেশে উপবেশন করিয়া পিতৃ'হান বালক পিতামহকে 'পিতা' বলিয়া সম্বোধন করিত, আর ভীষ্ম সজলনয়নে বালকের ভ্রম সংশোধন করিয়া দিতেন, আজ যাঁহাকে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করিতে ইচ্ছা করে, তাঁহাকে বিনাশ করিব কিরুপে ? অর্জ্জুন এই জন্য শোক কাতর । যে আচার্য্য অর্জ্জুনকে সর্ব্বপ্রধান করিবার জন্য অশ্বথামাকেও গোপন করিয়া অস্রশিক্ষা দিয়াছিলেন-যে আচার্য্য অর্জুনের প্রতিদ্বন্দ্বী কেহ না থাকে, এই জন্য একলব্যের নিকটে বৃদ্ধাঙ্গুলি গুরু-দক্ষিণা গ্রহণ করিয়াছিলেন, সেই গুরুকে প্রাণে বিনাশ করিতে হইবে-অর্জ্জুন কৃপা-পরবশ হইয়া যুদ্ধ হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইতেছেন । তুমি কি এই কৃপাবেশে আবিষ্ট হইয়া কর্ম্ম করিয়া থাক ? তুমি কি মনে ভাব-এই ধন গ্রহণ করিবে না, তুমি গ্রহণ করিলে অপর প্রতিদ্বন্দ্বীতায় মনঃপীড়া হইবে, অতএব গ্রহণ করা উচিত নহে-ইহা কি লোকের উক্তি ? তাই বলিতেছিলাম কিছু পার্থক্য আছে । অর্জ্জুনের বিষাদ আস্বাভাবিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করিবার জন্য বন্ধুবিনাশ প্রভৃতি হইতে উৎপন্ন হয় নাই, এ বিষাদের মূলে পাপ নাই, আছে গুরু বা আচার্য্য বিনাশভয় ! যাহা হউক এই বিশ্ববিজয়ী মহাপুরুষ আজ যুদ্ধাস্ত্র ত্যাগ করিয়া দীনভাবে দণ্ডায়মান । যাঁহার সব্যসাচিত্বে দেবাসুরে কেহই তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী হইতে সাহস পাইত না, যিনি শৌর্য্যে সুরোন্মাদিনী উর্ব্বশীকেও তুচ্ছ করিয়াছিলেন, এই শূর- এই বীর আজ অস্র নিক্ষেপ উদ্যত হইয়া আর অস্র নিক্ষেপ করিলেন না, অস্র পরিত্যাগ করিয়া কাতরে ঘোড়-করে দাঁড়াইয়াছেন ; এই লোকক্ষয়কর সমর প্রারম্ভে তাঁহার হৃদয় করুণায় পূর্ণ হইয়াছে ; যুদ্ধ ত্যাগ করিয়া আজ তিনি ভিক্ষাবৃত্তিগ্রহণে প্রস্তুত হইয়াছেন; আর সর্ব্ব-লোক-মহেশ্বর, ভক্ত-তরণীর কর্ণধার, দীনের বন্ধু, তাপিতের আশ্রয়, বিপন্নের মধুসুদন, এই কাতর জনের রথে সারথি ।

No comments:

Post a Comment