Tuesday, April 9, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-১১

গীতার স্থান, কাল ও পাত্র । পর্ব-৮
ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত ............।।
শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতায় পার্থসারথি কে ? শ্রী গীতা ইহার পরিচয় কতদূর দিবেন, আমরা এখানে তাহার আলোচনা অসঙ্গত মনে করি না ।
গীতা শাস্রে "ভগবান্‌ উবাচ" এই কথায় শ্রীকৃষ্ণকেই যে লক্ষ্য করা হইয়াছে, তাহাতে কাহারও কোন সন্দেহ নাই । এই শ্রীকৃষ্ণ যে অবতার, ইনি যে মায়া-মানুষ, ইনিই যে ধর্ম্মের গ্লানি এবং অধর্ম্মের অভ্যুত্থান হইলে অবতীর্ণ  হইয়া সাধুদিগের পরিত্রাণ এবং অসাধুদিগের বিনাশ সাধন করিয়া যুগে যুগে ধর্ম্ম সংস্থাপন করেন, তাহাও গীতাশাস্রে পাওয়া যায় ।
"শ্রীভগবানুবাচ"-তে পাওয়া যায়-
অজোহপি সন্নব্যইয়াত্মা ভুতানামীশ্বরোহপি সন্‌ ।
প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবামায়াত্মায়য়া ।।৪-৬
এই শ্রীভগবান্‌ শ্রীকৃষ্ণই অজ- জন্মরহিত ; ইনিই আবার ভূতসমূহের ঈশ্বর; ইনি আপনার প্রকৃতিতে অধিষ্ঠান করিয়া আত্মমায়া দ্বারা জন্মগ্রহণ করেন ।
এই শ্লোকে পাওয়া যাইতেছে,- যাঁহার জন্ম নাই, যিনি অব্যয় আত্মা, যিনি প্রাণীসমূহের ঈশ্বর, তিনিই তাঁহার প্রকৃতিতে অধিষ্ঠান করেন এবং আত্মমায়া প্রভাবে শ্রীকৃষ্ণরূপে জন্মগ্রহণ করেন ।
আমরা এখন জিজ্ঞাসা করি, যাঁহার জন্ম নাই, যিনি অজ, তিনি কোন্‌ বস্তু  ?
শ্রীমদ্ভাগবদ্‌গীতাতে জীবের আত্মাকেও অজ বলা হইয়াছে । এই জীবাত্মাই অবিনাশী, ইনিই অব্যয়, শরীরের বিনাশে ইহার বিনাশ হয় না ।
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচি-
ন্নায়ং ভুত্বা ভবিতা বা ন ভুয়ং ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হস্যতে হন্যমানে শরীরে ।।
জীবের আত্মা যিনি, তিনি কোন কালে জন্মেনও না, মরেনও না । ইনি হইয়া আবার যান, ইহাও নহে; অথবা না হইয়া আবার হন তাহাও নহে । হইয়া -জাত হইয়া তিরোভূত হওয়াকে লোকে মরিল বলিয়া বলে (আবার 'অভূত্বা'-না হইয়া 'ভবিতা'-হয়াকে লোকে জন্মান বলে) তাই বলা হইল আত্মার জনন মরণ নাই ; ইনি অজ ; এনি নিত্য-সর্ব্বদা একরূপ, ইনি শাশ্বত-সর্ব্বদা বর্ত্তমান ; ইনি পুরাণ-পুরা হইয়াও নব-সর্ব্বদা নতুন, অপুর্ব্ব ; শরীর হনন করিলেও ইনি হত হয়েন না ।
যিনি অজ, যিনি আব্যয়, তাঁহার সম্বন্ধেই পুনরায় বলা হইতেছে-শস্র ইহাকে কাটিতে পারে না, অগ্নি পোড়াইতে পারে না, জল ইহাকে পচাইতে পারে না, বায়ু ইহাকে শুষ্ক করিতে পারে না । ইনি আচ্ছেদ্য ; ইনি আদাহ্য ; ইনি অশোষ্য ; ইনি নিত্য, সর্ব্বব্যাপী, স্থিরস্বভাব ; ইনি চিরদিন আছেন ; ইনি ইন্দ্রিয়ের অগ্রাহ্য, চিন্তার অগোচর ; ইনি ষড়্‌ বিধ-বিকার-শূন্য ।
লক্ষ্য রাখিতে হইবে জীবাত্মাকে সর্ব্বগত-সর্ব্বব্যাপী বলা হইল ।  জীবাত্মা যেমন অজ, অব্যয়, অবিনাশী, সর্ব্বব্যাপী, পরমাত্মাও সেইরুপ । গীতা তবে দেখাইতেছেন-যিনি জীবাত্মা, তিনিই পরমাত্মা ! নতুবা উভয়েরই সর্ব্বগতত্ব, সর্ব্বব্যাপিত্ব বিশেষণ কেন দিবেন ? যিনি সর্ব্ববাব্যাপী, তিনি একই ; তিনি পূর্ণই । জীবাত্মাও পূর্ণ, আবার পরমাত্মাও পূর্ণ ; তবে জীবাত্মা ও পরমাত্মার প্রভেদ কি রহিল ? ফলে, শ্রুতি যেমন জীবাত্মাও পরমাত্মার প্রভেদ করেন না, শ্রুতি যেমন বলেন,- উপাধিগত পার্থক্য থাকিলেও বস্তুটি এক, আকাশ এক হইলেও ঘট-পটের পার্থক্য আছে বলিয়া এক আকাশকেই ঘটাকাশ, প্টাকাশ প্রভৃতি বহু নামে অভিহিত করা হয় মাত্র' সেইরুপ শ্রীগীতাও বলিতেছেন,-'আত্মা একটি হইলেও ইহাকেই কখনও বলা হয় ব্রক্ষ, কখনও ঈশ্বর, কখন জীব- এই ভিন্ন ভিন্ন  নাম রূপে নির্দ্দেশ কারা হয় ।' যাঁহারা গীতাশাস্র একটু মনোযোগের সহিত আলোচনা করিবেন, তাঁহারাই এ কথা সত্য বলিয়া বুঝিবেন । সেইজন্যই গীতাকে "অদ্বৈতামৃতবধিণী" বলা হইয়াছে ।

Sunday, April 7, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-১০

গীতার স্থান, কাল ও পাত্র । পর্ব-৭
ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত  ............।।

অর্জুন-বলিতেছেন-
ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ম্‌ কৃষ্ণ ন চ রাজ্যম্‌ সুখানি চ ।
কিম্‌ ন রাজ্যম্‌ গোবিন্দ কিম্‌ ভোগৈঃ জীবিতেন বা ।।"
কৃষ্ণ ! আমি রাজ্যও চাহিনা, ভোগও চাহি না, জীবনেও আমার প্রয়োজন নাই । অর্জ্জুন মহাপুরুষ । মহাপুরুষও সাধারণের মত কাতরোক্তি করেন- সাধারণে আশান্বিত হয়, অর্জ্জুনকে আপনাদের মত মনে করে । তথাপি অর্জ্জুনের সহিত সাধারণের কোন বিশেষ সাদৃশ্য নাই । অর্জ্জুন মহাপুরুষ, তাহারা কাপুরুষ । জীবন-সংগ্রামে ভীত হইয়া লোকে শতবার বলে "আর পারি না" মৃত্যু হইলেই ভাল হয়" । অর্জ্জুন কিন্তু 'পারি না' বলিতেছেন না, বলিতেছেন 'যুদ্ধ করিব না' কারণ যুদ্ধ করা নিষ্ঠুরের কার্য্য, আমি নিষ্ঠুর হইতে চাহি না । ক্লেশের চয়ে বা প্রাণের ভয়ে কিন্তু অর্জ্জুন যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত হইতেছেন না, হইতেছেন করুণায়-পাছে অপরের জীবন নষ্ট হয় এই জন্য-কিরুপে গুরুকে শরদ্বারা বিদ্ধ করিবেন, কিরুপে পিতামহকে অস্রাঘাত করিবেন, এই জন্য । ভীষ্ম ও দ্রোণের কথা অর্জ্জুন একধিক বার উল্লেখ করিয়াছেন । যে পিতামহের ক্রোড়েদেশে উপবেশন করিয়া পিতৃ'হান বালক পিতামহকে 'পিতা' বলিয়া সম্বোধন করিত, আর ভীষ্ম সজলনয়নে বালকের ভ্রম সংশোধন করিয়া দিতেন, আজ যাঁহাকে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করিতে ইচ্ছা করে, তাঁহাকে বিনাশ করিব কিরুপে ? অর্জ্জুন এই জন্য শোক কাতর । যে আচার্য্য অর্জ্জুনকে সর্ব্বপ্রধান করিবার জন্য অশ্বথামাকেও গোপন করিয়া অস্রশিক্ষা দিয়াছিলেন-যে আচার্য্য অর্জুনের প্রতিদ্বন্দ্বী কেহ না থাকে, এই জন্য একলব্যের নিকটে বৃদ্ধাঙ্গুলি গুরু-দক্ষিণা গ্রহণ করিয়াছিলেন, সেই গুরুকে প্রাণে বিনাশ করিতে হইবে-অর্জ্জুন কৃপা-পরবশ হইয়া যুদ্ধ হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইতেছেন । তুমি কি এই কৃপাবেশে আবিষ্ট হইয়া কর্ম্ম করিয়া থাক ? তুমি কি মনে ভাব-এই ধন গ্রহণ করিবে না, তুমি গ্রহণ করিলে অপর প্রতিদ্বন্দ্বীতায় মনঃপীড়া হইবে, অতএব গ্রহণ করা উচিত নহে-ইহা কি লোকের উক্তি ? তাই বলিতেছিলাম কিছু পার্থক্য আছে । অর্জ্জুনের বিষাদ আস্বাভাবিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করিবার জন্য বন্ধুবিনাশ প্রভৃতি হইতে উৎপন্ন হয় নাই, এ বিষাদের মূলে পাপ নাই, আছে গুরু বা আচার্য্য বিনাশভয় ! যাহা হউক এই বিশ্ববিজয়ী মহাপুরুষ আজ যুদ্ধাস্ত্র ত্যাগ করিয়া দীনভাবে দণ্ডায়মান । যাঁহার সব্যসাচিত্বে দেবাসুরে কেহই তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী হইতে সাহস পাইত না, যিনি শৌর্য্যে সুরোন্মাদিনী উর্ব্বশীকেও তুচ্ছ করিয়াছিলেন, এই শূর- এই বীর আজ অস্র নিক্ষেপ উদ্যত হইয়া আর অস্র নিক্ষেপ করিলেন না, অস্র পরিত্যাগ করিয়া কাতরে ঘোড়-করে দাঁড়াইয়াছেন ; এই লোকক্ষয়কর সমর প্রারম্ভে তাঁহার হৃদয় করুণায় পূর্ণ হইয়াছে ; যুদ্ধ ত্যাগ করিয়া আজ তিনি ভিক্ষাবৃত্তিগ্রহণে প্রস্তুত হইয়াছেন; আর সর্ব্ব-লোক-মহেশ্বর, ভক্ত-তরণীর কর্ণধার, দীনের বন্ধু, তাপিতের আশ্রয়, বিপন্নের মধুসুদন, এই কাতর জনের রথে সারথি ।

Friday, April 5, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-৯

 * দ্বিতীয় কথা *
 -গীতার স্থান, কাল ও পাত্র - পর্ব-৬

ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত ............।।
যেখানে অর্জ্জুন দুঃখ করিতেছিলেন-আত্মীয়স্বজন মরিবে, সেইখানে ভগবান্‌ কোন প্রকার দুর্ব্বলতার উপদেশ দিলেন না । যাহা সত্য তাহাই বলিলেন । বলিলেন তুমি পন্দিতের মত কথা কহিতেছ কিন্তু মূর্খের মত কার্য্য করিতেছ । তুমি অশোচ্য বিষয়ে শোক করিতেছ । ভীষ্ম দ্রোণাদীর দেহগুলিই কিছু ভেষ্ম দ্রোণ নহে । ইহাদের আত্মাই ইহারা । কিন্তু 'আত্মার মৃত্যু নাই; । এই সমস্ত ব্যক্তির "আত্মা"আজয় আমর । ইহাঁরা আত্মা নহে ইহাঁরা দেহ এই দেহাত্মবোধ তুমি কেন করিতেছ ? তোমর জানা উচিত আত্মা-    
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ, নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ।।
জীবের আত্মা শরীর নষ্ট হইলেও মরে না । এই আত্মার জন্ম নাই, মৃত্যু নাই । বালক যোদ্ধা প্রসিদ্ধ বীরপুরুষদিগের নিকট অস্রপরীক্ষা দিতে গিয়া যেরূপ কম্পিত হয়, বালক নক্তা জগন্মান্য পণ্ডিতমন্ডলী-মধ্যে প্রথম মুখ খুলিবার সময় যেরূপ ঘর্ম্মাক্ত-কলেবর হয়, শুষ্ক-মুখে আপন হৃদয়ে যেরূপ গুরুতর ঘাতপ্রতিঘাত উপলব্ধি করে, অর্জ্জুনের ততোধিক হইতেছে, অথচ অর্জ্জুন বিশ্ববিজয়ী মহাপুরুষ । কিরাতরুপী ভগবান্‌ পিনাকপাণি এই অর্জ্জুনের পরাক্রমে পরিতুষ্ট হইয়া বলিয়াছিলেন-
ভো ভো ফল্গুন ! তুষ্টোহস্মি কর্ম্মণাহপ্রতিমেন তে ।
শৌর্য্যেণানেন ধৃত্যা চ ক্ষত্রিয়ো নাস্তি তে সমঃ ।।
হে অর্জ্জুন ! তোমার কর্ম্মে বড়ই তুষ্ট হইলাম, ধৃতি ও শৌর্য্য তোমার মত ক্ষত্রিয় আর নাই । যখন কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের অব্যবহিতপুর্ব্বে এই অর্জ্জুন বিরাট রাজকুমার উত্তরের সারথ্য করিয়াছিলেন, যখন উত্তর ভীত হইয়া ক্লীব বৃহন্নলার ভীতি উৎপাদন জন্য পুনঃ পুনঃ কৌরবসৈন্য দেখাইতেছিলেন, পুনঃ পুঃ ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, শল্যাদি কুরিবীরগণের নামোল্লেখ করিতেছিলেন, আর বলিতেছিলেন-তুমি একাকী, কিরুপে এই প্রবল-পরাক্রম মহারথগণের সহিত যুদ্ধ করিবে, তখন যে অর্জ্জুন সগর্ব্বে বিরাট-পুত্রকে উত্তর করিয়াছিলেন-'উত্তর ! যখন দ্রৌপদী-স্বয়ংবরে লক্ষাধিক নরপতি আমায় আক্রমণ করিয়াছিল, তখন আমি একা-কে তখন আমায় সহায় হইয়াছিল ? যখন কালান্তক যমতুল্য অগণিত নিবাতকবচগণের সহিত আমি যুদ্ধ করিয়াছিলাম, কে তখন আমায় সাহায্যার্থ আসিয়াছিল ?' যে অর্জ্জুন ঐ সময়ে উত্তরকে সারথি করিয়া বহুবার ভীষ্ম দ্রোণাদি মহারথগণকে পরাস্ত করিয়াছিলেন, দুর্য্যোধনাদির প্রাণসংহার সমর্থ হইয়াও যিনি সন্মোহন-অস্রে কৌরব-শত্রুদিগকে মূচ্ছিত মাত্র করিয়াছিলেন, প্রাণসংহার করেন নাই, সেই অর্জ্জুন আজ বলিতেছেন-
"ন চ শক্লোমি অবস্থাতুম্‌ ভ্রমতী ইব চ মে মনঃ ।"
হে কৃষ্ণ ! হে অচ্যুত ! আমি আর অবস্থান করিতে পারিতেছি না, আমার মস্তক ঘুর্ণিত হইতেছে-
  চলবে........................................................................।

Wednesday, March 20, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-৮

* দ্বিতীয় কথা *
      গীতার স্থান, কাল ও পাত্র  পর্ব-৫।
ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত ............।।
দেখিতে দেখিতে রথ উভয়সেনার মধ্যস্থলে আনীত হইল । অর্জ্জুন দেখিতেছেন-আত্মীয়, স্বজন, পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, সখা, শ্বশুর-সকলেই যুদ্ধার্থ সমবেত । সহসা মনের গতি পরিবর্ত্তিত হিল-ক্রোধ দূরে গেল, আসিল নির্ব্বেদ । এই অর্জ্জুন-চরিত্রে আমাদের প্রয়োজন । সত্যকথা, অর্জ্জুনের মত শাস্র-মর্য্যাদা অর্জ্জুনের মত গুরুমর্য্যাদা, অর্জ্জুনের মত লক-মর্য্যাদা আর আমরা দেখিতে পাই না । তথাপি যখন দেখি, এই মহান্‌ চরিত্র প্রবল উৎসাহে কর্ম্মক্ষেত্রে উপস্থিত হইয়া কর্ত্তব্যের নিষ্ঠুরতা অনুভব করিয়া আমাদের মত চিত্তের দুর্ব্বলতা দেখাইতেছেন, যখন দেখি কর্ত্তব্যের গুরুভারে নিষ্পেষিত হিয়া-শোক-মোহাচ্ছন্ন হইলে আমাদের যাহা হয়-অর্জ্জুনের তাহাই হইতেছে, তখন অর্জ্জুনকে আমাদের মত ভাবিয়া অর্জ্জুনের সহিত সহানুভুতির দেখাইতে আমরা প্রস্তুত হই । বড় ব্যগ্র হইয়া শুনিতে চাই, অর্জ্জুন কি বলিতেছেন ? অর্জ্জুন বলিতেছেন-
দৃষ্ট্বেমান্‌ স্বজনান্‌ কৃষ্ণ যুযুৎসূন্‌ সম্বস্থিতান্‌ ।
স্ব্বদস্তি মমগাত্রাণি মুখঞ্চ পরিশুষ্যতি ।।
বেপথুশ্চ শরীরে মে রোমহর্ষশ্চ জায়তে ।
গাণ্ডীবং স্রংসতে হস্তাৎ ত্বক্‌ চৈব পরিদহ্যতে ।।
বলিতেছেন-হে কৃষ্ণ ! হে কেশব ! এই সমস্ত স্বজনকে যুদ্ধ করিতে আসিতে দেখিয়া আমার অঙ্গ অবসন্ন হইতেছে, শরীর কম্পিত হইতেছে, রোমহর্ষ হইতেছে, হস্ত হইতে গাণ্ডীব স্থলিত হইতেছে এবং ত্বক্‌ দগ্ধ হইয়া যাইতেছে । আমি আর অবস্থান করিতে পারিতেছি না, আমার মন বিঘুর্ণিত হইতেছে, নানাপ্রকার অমঙ্গল দেখিতেছি-অর্জ্জুনের বিষাদ-শান্তির জন্য ভগবান্‌ ব্রাক্ষীস্থিতি উপদেশ প্রদান করিলেন । ভগবান শঙ্কর ব্রাক্ষীস্থিতি অর্থে বলিতেছেন-"ব্রক্ষণি ভবেয়ং স্থিতিঃ, সর্ব্বকর্ম্ম সংন্যস্য ব্রক্ষরুপেণৈবাবস্থামিত্যেতৎ" অর্থাৎ সর্ব্বকর্ম্ম সন্ন্যাস্পুর্ব্বক ব্রক্ষরূপে অবস্থানের নাম ব্রাক্ষীস্থিতি । ব্রাক্ষীস্থিতি, ব্রক্ষনির্ব্বাণ, আত্মজ্ঞান ইত্যাদি একই কথা । ব্রাক্ষীস্থিতি ভিন্ন শোকের চিরনিবৃত্তি হইতে পারে না । অন্য অন্য উপায়ে শোক দুঃখের ক্ষণিক নিবৃত্তি হইতে পারে সত্য, কিন্তু ক্ষণিক-নিবৃত্তি জন্য বুদ্ধিমান্‌ ব্যক্তি ব্যাকুল নহেন । কারণ গুরুকর্ত্তব্যপালনে লঘুকর্ত্তব্যের সুখ অবশ্যই লাভ হয় । আত্যন্তিক একমাত্র প্রয়োজন । সাংখ্য-শাস্রে এই আত্যন্তিক নিবৃত্তিই লক্ষ্য, যোগশাস্রে এই আত্যন্তিক নিবৃত্তির উপায়-চিত্তবৃত্তি নিরোধ-করিয়া দ্রষ্টার স্বরুপে অবস্থান; বেদান্ত ইহারই জন্য ব্রক্ষ-জিজ্ঞাসা । গীতা দ্বিতীয় অধ্যায়ে ব্রাক্ষীস্থিতির স্বরুপ বুঝাইয়াছেন এবং বাকী অধ্যায়গুলি এই স্থিতি কিরুপে লাভ হইবে, তজ্জন্য সাধনার ক্রম দেখাইয়াছেন । আমরা অতিসংক্ষেপে গীতোক্ত ব্রাক্ষীস্তিতি বা মুক্তির আলোচনা করিব । গীতার প্রথম অধ্যায়ে বিষাদ-যোগ, শেষ-অধ্যায়ে মোক্ষ যোগ ।

Thursday, March 14, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-৭

                                                          * দ্বিতীয় কথা *                                                            
 গীতার স্থান, কাল ও পাত্র -পর্ব-০৪ ।
ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত ............।।
পাণ্ডব-সৈন্য দেখাইতে দেখাইতে দুর্য্যোধনের মনে ভীতির সঞ্চার হইয়াছে । বিশেষ ভিতরে অন্যায় আছে । রাজা অন্তর্ভীতি আচ্ছাদন করিয়া আপনাকে আশ্বস্ত করিবার জন্য তখন আপন পক্ষের প্রধান প্রধান সেনানায়কদিগের নামোল্লেখ করিতে লাগিলেন, বলিলেন-আমার পক্ষেও আপনি, ভীষ্ম, কর্ণ, যুদ্ধবিজয়ী কৃপ, আশ্বথামা, বিকর্ণ, সোমদত্ত-পুত্র ভুরিশ্রবা এবং রাজা জয়দ্রথ আরও অনেক অনেক বীর আমার জন্য জীবনত্যাগে কৃতনিশ্চয় হইয়াছেন; ইহারা সকলেই অস্রধারী ও যুদ্ধবিশারদ । আমাদের সৈন্য ভীষ্ম কর্ত্তৃক রক্ষিত এবং অপর্য্যাপ্ত । আপনারা সকলে স্ব স্ব বিভাগ অনুসারে বুহ্য রচনা করিয়া ভীষ্মকে সর্ব্বপ্রকারে রক্ষা করুন । ভীষ্ম যখন শত্রুর সহিত যুদ্ধ করিবেন, তখন যেন কোন শত্রু তাঁহাকে আক্রমণ করিতে না পারে ।
দুর্য্যোধন নানা কথা কহিলেন,কিন্তু আচার্য্য কোন কথার উত্তর দিলেন না । দূর হইতে পিতামহ দুর্য্যোধনকে লক্ষ্য করিতেছিলেন, দুর্য্যোধনের মনের অবস্থা বুঝিলেন । ভীষ্ম পিতামহ-দ্রোণ-অপেক্ষা আত্মজন । ভয়ভীত দুর্য্যোধনের উৎসাহ জন্য তিনি শঙ্খধ্বনি করিলেন, তখন শত শত শঙ্খ, ভেরী, মাদল, পটহ, গোমুখ, প্রভৃতি রণবাদ্য একেবারে বাজিয়া উঠিল; তুমুল শব্দে আকাশ ও রণভূমি পরিপূরিত হইল । পুস্তক বন্ধ করিয়া এই দৃশ্য স্মরণ কর ।
একবার দুটি চক্ষু উন্মীলন কর, আবার দেখ কি সুন্দর- দেখ শ্বেতাশ্বযুক্ত মহারথাসীন কৃষ্ণার্জ্জুন আপন আপন শঙ্খধ্বনি করিতেছেন । শ্রীকৃষ্ণের পাঞ্চজন্যের সহিত পঞ্চ পাণ্ডবের শঙ্খ নিনাদিত হইল । দ্রুপাদাদি নরপতিগণ  পৃথক্‌ পৃথক শঙ্খ বাদন করিলেন । অতিভৈরব সেই শঙ্খধ্বনি পৃথিবী ও আকাশ তুমুল করিয়া তুলিল, এবং ধার্ত্তরাষ্ট্রগণের হৃদয় যেন বিদীর্ণ করিতে লাগিল ।
ক্রমে রণবাদ্য মন্দীভুত হইল, আবার সেই অগনিত সৈন্য, অবৃষ্টিসংরম্ভ অম্বুবাহের ন্যায়, অনুত্তরঙ্গ জলরাশির ন্যায় গম্ভীর হইল, গীতার দ্বিতীয় দৃশ্যে স্বতন্ত্র অভিনয় অনুভব কর । উৎকট শঙ্খনিনাদে কেহই রণে ভঙ্গ দিল না, বরং স্পর্দ্ধাসহ দণ্ডায়মান রহিল । সমর-কেশরী অর্জ্জুন ক্রুদ্ধ !
বারণাবতের ভীষণ কু-অভিসন্ধি, দ্যুতক্রীড়ার নৃশংস কপটাচার, দ্রৌপদী-বস্রহরণের দারুণ আপমান, অজ্ঞাতবাসের বিজাতীয় ক্লেশ সেই ক্রোধাগ্নিতে ফুৎকার দিতেছে । অর্জ্জুন গাণ্ডীব উত্তোলন করিয়াছেন- অস্র নিক্ষেপ করিবেন, সহসা অন্য বাসনা জাগিল ।
প্রবৃত্তে শস্রসম্পাতে ধনুরুদ্যম্য পাণ্ডবঃ ।
হৃষীকেশং তদা বাক্যমিদমাহ মহীপতে ।।
অর্জ্জুন সমরার্থে  অবস্থিত রাজন্য-বর্গকে দেখিতে চাহিলেন, হৃষীকেশকে বলিলেন হে অচ্যুত ! যতক্ষণ পর্য্যন্ত না আমি যুদ্ধকামী, দুর্ব্বুদ্ধি দুর্য্যোধনের হিতাকাঙ্খী এই নরপতি সমুহকে নিরীক্ষণ করি, তাবৎকাল তুমি উভয়-সেনার মধ্যে রথ স্থাপন কর ! শ্রীভগবান্‌ তাহাই করিলেন ।
চলবে...

Tuesday, March 12, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-৬

                                                                    * দ্বিতীয় কথা *
                                                                 গীতার স্থান, কাল ও পাত্র -পর্ব ০৩।
ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত ............।।
এক্ষণে আমরা পাত্রের বিষয় আলোচনা করিব । ইহার আলোচনা বিশেষ ভাবেই করা উচিত । কারণ গীতার কাব্যাংশ মনন করিতে পারিলে-ভগবান্‌ ও অর্জ্জুনের ব্যবহার হৃদয় মধ্যে অঙ্কিত করিতে পারিলে-সহজেই লয়-বিপক্ষের হস্ত হইতে অব্যাহতি পাওয়া যায়- সহজে চিত্তশুদ্ধিলাভ করা যায় ।
আমরা প্রথমেই দেখি মন্যুময়  মহারাজ দুর্য্যোধন রণসজ্জা করিয়া সসৈন্যে কুরুক্ষেত্র-মুখে সাজিয়া চলিলেন । সৈন্যসংখ্যা একাদশ-অক্ষৌহিণী ।
জৈমিনি-ভারতে অক্ষৌহিণীর ওকটি সহজ তালিকা প্রদত্ত হইয়াছে । দশসহস্র হস্তীর প্রত্যেকটি রক্ষা জন্য একশত করিয়া রথ, প্রত্যেক রথ রক্ষা জন্য একশত করিয়া পদাতিক ইহাই অক্ষৌহিণীর স্থূল হিসাব । গোস্বামী তুলসী দাস তাঁহার রামায়ণে যে ভাবে অক্ষৌহিণীর গণনা করিয়াছেন তাহাই সুক্ষ্ম গগনা । এখানে ঐ গননা সন্ নিবেশিত করা হইল ।
।----------।----------।----------।----------।---------।----------।
।        সংজ্ঞা  ।       রথ    ।       হস্তী     ।       অশ্ব    ।     পদাতি  ।       সমষ্টি   ।
।----------।----------।----------।----------।---------।----------।
।     পত্তি      ।         ১     ।        ১      ।       ৩     ।        ৫     ।       ১০    ।
।----------।----------।----------।----------।---------।----------।
।      সেনামুখ  ।        ৩     ।        ৩     ।         ৯    ।        ১৫   ।        ৩০   ।
।----------।----------।----------।----------।---------।----------।
।    গুল্ম        ।         ৯    ।         ৯    ।          ২৭   ।        ৪৫   ।        ৯০   ।
।----------।----------।----------।----------।---------।----------।
।     গণ       ।           ২৭  ।          ২৭   ।         ৮১  ।      ১৩৫  ।          ২৭০ ।
।----------।----------।----------।----------।----------।---------।
।      বাহিনী   ।        ৮১   ।        ৮১   ।        ২৪৩   ।       ৪০৫   ।      ৮১০  ।
।----------।----------।----------।----------।----------।---------।
।       পুতনা   ।        ২৪৩  ।        ২৪৩  ।        ৭২৯   ।       ১২১৫  ।      ২৪৩০ ।
।----------।----------।----------।----------।----------।---------।
।       চমূ     ।        ৭২৯   ।        ৭২৯   ।       ২১৮৭  ।       ৩৬৪৫ ।      ৭২৯০ । 
।----------।----------।----------।----------।----------।---------।
।     অনীকিনী ।      ২১৮৭   ।       ২১৮৭  ।     ৬৫৬১   ।      ১০৯৩৫ ।    ২১৮৭০ ।
।----------।----------।----------।----------।----------।---------।
।     অক্ষৌহিণী ।     ২১৮৭০  ।      ২১৮৭০ ।    ৬৫৬৬১০।     ১০৯৩৫০ ।    ২১৮৭০০।
।----------।----------।----------।----------।----------।---------।
আর যে মণ্ডলাকার স্থানে যুদ্ধ হইয়াছিল, তাহার পরিমাণ পঞ্চ-যোজন অর্থাৎ বিশ ক্রোশ । উপস্থিত সময়ে যে স্থান টুকুকে কুরুক্ষেত্র বলে, সে স্থানে অষ্টাদশ-অক্ষৌহিণী সঙ্কুলন হোউ না সত্য, কিন্তু যাঁহারা মহাভারত দেখিয়াছেন, তাঁহারা জানেন-পাঞ্জাব প্রদেশের দূর দুরবর্ত্তী স্থান জুড়িয়া এই সৈন্য সামন্ত অবস্থান করিয়াছিল । আমরা গীতা-পুর্ব্বাধ্যায়ে এই সমস্ত স্থান উল্লেখ করিয়াছি । আরও এক কথা-সমস্ত সৈন্য এককালে যুদ্ধ করে নাই, ভিন্ন ভিন্ন সেনানায়ক আপন আপন সৈন্য লইয়া ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সমরাঙ্গনে আসিতেছিলেন, ইহাও মহাভারতে উল্লেখ আছে । যাহা হউক একাদশ-অক্ষৌহিণী সৈন্য লইয়া দুর্য্যোধন কুরুক্ষেত্রের দক্ষিণ পশ্চিম বিভাগে সেনানিবেশ করিলেন, আর পাণ্ডবেরা উত্তর-পূর্ব্বদিকে সপ্ত অক্ষৌহিণী সৈন্য লইয়া প্রস্তুত রহিলেন ।
মনে মনে গীতার এই প্রথম দৃশ্য অঙ্কিত কর, শরীর রোমাঞ্চিত হইবে । সন্মুখে বিস্তীর্ণ কুরুক্ষেত্র-প্রান্তর । এই বিশাল কুরুক্ষেত্রে অগনিত কুরুসৈন্য যুদ্ধার্থ সুসজ্জিত, কোথাও আর স্থান নাই । দ্বাপর-যুগের প্রায় সমস্ত রাজন্যবর্গ এখানে পরিলক্ষিত হইতেছে ; সঞ্জয় স্বচক্ষে যাহা দেখিয়া আসিয়াছিলেন, এবং দিব্যচক্ষুতে যাহা দেখিয়াছিলেন, ধৃত্ররাষ্ট্রকে তাঁহারই সংবাদ দিতেছিলেন, বলিতে ছিলেন-রাজন্‌ ! ঐ দেখ, সসাগরা ধরণীর অধীশ্বর হইয়াও মহামানী রাজা দুর্য্যোধন রাজবেশে পদব্রজে আচার্য্যের নিকট গমন করিতেছেন । দ্রুত গমনে নানারত্ন-বিজড়িত শিরতাজ রাজমস্তকে কম্পিত হইতেছে । আজ পাণ্ডবসৈন্য দেখিয়া নিজ মর্য্যাদা ভুলিয়াছেন, সেনাপতিকে না দাকাইয়া নিজেই দৌড়িয়া যাইতেছেন । ঐ দেখ, রাজনীতি-কুশল মহারাজ নিজের ভীতি সঙ্গপন করিয়া সংক্ষিপ্ত অথচ বহু-অর্থযুক্ত বাক্যে আচার্য্যকে অঙ্গুলি তুলিয়া পাণ্ডব-সৈন্য দেখাইতেছেন । বলিতেছেন, হে গুরো ! ঐ দেখুন, আপনার শিষ্য ধীমান্‌ দ্রুপদপুত্র-বিরচিত পাণ্ডব-চমু কিরুপে সজ্জিকৃত হইয়াছে । গুরুর ক্রোধোদ্রক করাই দুর্য্যোধনের উদ্দেশ্য । ধৃদ্যুম্ন্য শিষ্য হইয়াও গুরুর বধোপায় কৌশলে জানিয়া লইয়াছে । এক্ষণে সেনাপতিত্ব গ্রহণ করিয়া বিনাশার্থ আসিইয়াছে আরও দেখুন, এই সৈন্যমধ্যে শূর, বাণক্ষেপকুশল, যুদ্ধে ভীমার্জ্জুন তুল্য মহারথ যুযুধান, বিরাট, দ্রুপদ, ধৃষ্টকেতু, চেকিতান, কাশীরাজ, বীর্য্যবান্‌ পুরুজিৎ, কুন্তিভোজ, নরশ্রেষ্ঠ শৈব্য, বিক্রমশালী যুধামুন্য, বীর্য্যবান্‌ উত্তমৌজা, সুভদ্রাপুত্র অভিমন্যু, এবং দৌপদীর পুত্রগণ, ইহারা সকলেই মহারথ । শস্র-শাস্র-প্রবীণ মহারথা, একাকী দশসহস্র ধনুর্দ্ধারীর সহিত যুদ্ধে সমর্থ, এতদ্ভিন্ন শত শত অতিরথ, লক্ষ লক্ষ রথী ও অর্দ্ধরথ রহিয়াছে ।

Sunday, March 10, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-৫

                                                                   * দ্বিতীয় কথা *
                                                              গীতার স্থান, কাল ও পাত্র -পর্ব-০২।

তাঁহার পর গীতার কাল ? প্রবল ঝটিকার পূর্ব্ব মুহূর্ত্তে প্রকৃতি কত শান্ত অনুভব কর ! নারায়ণ বিনাশ-কামনায় সমবেত নরপুঞ্জ নিরীক্ষণ করিতেছেন- আপনবিকৃত অঙ্গ আপনি ছেদন করিবেন, তাই আপনাকে আপনি অবলোকন করিতেছেন । এখনই রুধির-স্রোত প্রবাহিত হইবে, সমবেত জনসঙ্ঘ বিনষ্ট হইবে, পৃথিবীর পাপভার দূর হইবে, ভারতরমণীর হাহাকারে দিগন্ত প্রতিধ্বনিত হইবে । এখন কিন্তু সসৈন্য সমবেত রাজন্যমণ্ডলী স্থির, এখনও পরস্পর বিধ্বংসকারী দুই মহাসমুদ্র স্তম্ভিত-মহাসমুদ্রে একটিও তরঙ্গ ভঙ্গ দৃষ্ট হইতেছে না । বিদ্যুত-বজ্র পরিপুরিত দুই প্রলয় মেঘ পরস্পর পরস্পরকে দেখিতেছে । গভীর গর্জ্জনে এখনও পরস্পর পরস্পরের উপর ভাঙ্গিয়া পড়ে নাই । এখনও বিদ্যুৎ বজ্রাঘাতের সহিত দুঃসহ বারিবর্ষণ আরম্ভ হয় নাই । প্রতি বীর-হৃদয়ে অগ্নি-জ্বলিতেছে । অচিরে এই সমরাগ্নি সমস্ত জীবপুঞ্জ দগ্ধ করিবে । অচিরেই সমর প্রাঙ্গণ রুধিরাপ্লুত হইবে । রুধিরাপ্লুত কুরুক্ষেত্র প্রলয়কালে অনল-গোলক-বৎ পৃথিবী মত প্রতীয়মান হইবে । এই লক-ক্ষয়কর মহাযুদ্ধারম্ভের অব্যবহিত পূর্ব্বে গীতা উপদিষ্ট হইয়াছিল । যুদ্ধক্ষেত্রে গীতা উপদেশ সম্ভব কি অসম্ভব, ইহার বিচার পুস্তক মধ্যে করা হইয়াছে ।  
ধারাবাহিক ভাবে প্রচারিত.......................।.............................................।।।চলবে

Friday, March 8, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-৪

                                                                    * দ্বিতীয় কথা *
                                                                -গীতার স্থান, কাল ও পাত্র  - পর্ব-১
ধারাবাহিক ভাবে প্রচারিত.......................।
স্থান, কাল ও পাত্র কাব্য সম্বন্ধেই আলোচিত হইয়া থাকে । গীতা কি কাব্য ? যদিও গীতা ধর্ম্মগ্রন্থ, যদিও গীতা সর্ব্ব-উপনিষদের সার, যদিও গীতা সর্ব্বশাস্রময়ী, তথাপী ইহার প্রথম অধ্যায়ে কাব্যের সমৃদ্ধ উপাদান দৃষ্ট হয় । পুজনীয় গীতা- রহস্যকার বলেন- "কাব্যাংশে ভগবদগীতা ভূতলে অতুল । স্থান, কাল ও পাত্র সম্বন্ধে এরুপ সমৃদ্ধ কাব্য আর কোথায় ?"
প্রথমেই স্থান-সম্বন্ধে আলোচনা করা যাউক । গীতার উৎপত্তি স্থান কুরুক্ষেত্রের মহাসমর-ক্ষেত্র । স্বচক্ষে দেখিয়া আইস কি এক মহাশ্মশান এই কুরুক্ষেত্র ! কি এক দুর্ব্বিষহ বিষাদগীত এইস্থানে নিরন্তর গীত হইতেছে । আজিও এই কুরুক্ষেত্রের যেদিকে অবলোকন করিবে, সর্ব্বত্রই দেখিবে বিনাশচিহ্ন । প্রাচীন বৃক্ষ, প্রাচীন কুগুতড়াগাদির কথা ছাড়িয়া দাও, নতুন যাহা কিছু হইতেছে, তাহাও যেন অক্ষুন্ন থাকে না । সমর-ক্ষেত্রে যে সমস্ত লতাগুল্ম  দি জন্মিয়াছে, দেখিলে বোধ হয়। যেন রুধির হইতেই ইহার উৎপন্ন । এই স্থানেই ভগবান্‌ পরশুরাম একবিংশ বার ক্ষত্রিয়শোণিতে পৃথিবীকে রুধিরাক্ত করিয়াছিলেন । যে শোণিতময় পঞ্চহ্রদে তিনি পিতৃলোকের তর্পন করিয়াছিলেন, এখনও সেই পঞ্চহ্রদ পুরাকালের ইতিহাস প্রচার করিতেছে । এখনও সমন্তপঞ্চকে কত লোক প্রতিবৎসর স্নানার্থ গমন করে । কালপুরুষ কর্ত্তৃক তাড়িত হইয়া আজ অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা কুরুক্ষেত্রে সমবেত হইয়াছে । সন্মুখে রণ-নদী- এই রণ-নদীর বর্ণনা সুন্দর !
ভীষ্ম- দ্রোণ-তটা জয়দ্রথ-জলা গান্ধার-নীলোৎপলা
শল্য-গ্রাহবতী কৃপেণ বহনী কর্ণেন বেলাকুলা ।
অশ্বথামা-বিকর্ণ-ঘোরমকরা দুর্য্যোধনাবর্ত্তিনী
সোত্তীর্ণা খলু পাণ্ডবৈ রণ-নদী কৈবর্ত্তকঃ কেশবঃ ।।
অত্যুচ্চ তটশালিনী সমরনদী দু'কুল প্লাবিত করিয়া ছুটিয়াছে । এই খরস্রোতের জলে লোথাও প্রচণ্ড আবর্ত্ত, কোথাও ভয়ঙ্কর কুম্ভীর, কোথাও বা সুন্দর নীলোৎপল ! ভীষ্ম দ্রোণ ইহারা তটভুমি, জয়দ্রথ ইহারা জলরাশি, দুর্য্যোধন প্রচণ্ড আবর্ত্ত, শল্য কুম্ভীর, কৃপ বহনী-প্রবাহ, কর্ণ বেলাভূমি, অশ্বথামা ও বিকর্ণ ঘোর মকর । পাণ্ডবদিগকে এই রণ নদীর পরপারে যাইতে হইবে স্বয়ং কেশব ইহার কৈর্বত্ত-কাণ্ডারি । সমষ্টি-ভাবে যে ভগবৎ-সাগরে এই রণ-নদী মিশিয়াছে, বিশ্বরুপ দেখাইবার সময়ে যাহা ভগবান্‌ ভক্তকে দেখাইয়াছেন, সেই ভগবান, ব্যষ্টিভাবে পাণ্ডব-তরণী  কর্ণধাররুপে আজ আপন জলে আপনি ক্রীড়া করিতে ইচ্ছা করিয়াছে । জীবপুঞ্জকে তাড়িত করিয়া এই ভীষণ কুরুক্ষেত্রে আনয়ন করিয়াছেন । তাই বলিতেছিলাম- কুরুক্ষেত্রের মত ভীষণ সমর-ক্ষেত্র আর কোথায় ?http://www.facebook.com/SrimadbhagavadGita.Bangla...........................................................।।।চলবে

Wednesday, March 6, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-৩

* প্রথম কথা *
-গীতার আদর - পর্ব-৩
ধারাবাহিক ভাবে প্রচারিত ............পর্ব-৩

গীতাগ্রন্থকে মানুষের মত জীবন্ত মনে করিয়া সম্বোধন করা হইয়াছে । অনেকে মনে ভাবিতে পারেন ইহা কি প্রকার ভক্তি ? পুস্তুক আবার মানুষের মত কিরুপে হইবে ? আবার কেহ কেহ ইহা সত্যও ভাবিতে পারেন । "গীতা মে হৃদয়ং পার্থ" । যাহা শ্রীভগবানের হৃদয় তাহা জড় বলিয়া নাই ভাব হইল-ইহাতে কি কিছু অতিরঞ্জিত আছে ? মানুষের হস্ত পদ চক্ষু কর্ণাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জড়; এই গুলিকে মানুষ বলা হয় না । স্থুল আবরণগুলিকে জীবন্ত করিয়া যে চৈতন্য পুরুষ বিরাজিত, তিনিই মানুষ । 
জড় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবলম্বন করিয়াই তিনি প্রকাশ পাইয়া থাকেন । গীতাগ্রন্থের অক্ষরগুলিকে শব্দমাত্র বলা হইলেও সেই শব্দরাশির অর্থ দ্বারা যে আত্মদেব প্রকাশিত তিনিই শ্রীগীতা । ইনিই সমকালে অক্ষর বা অব্যক্ত বা নির্গুণ ব্রক্ষ, ইনিই সগুণ ব্রক্ষ বা বিশ্বরুপ, ইনিই মায়ামানুষ বা মায়া-মানুষী, ইনিই প্রতি জীবের আত্মা । জড় আবরণটি মায়া, ভিতরের হৃদয়টিই আত্মদেব বা আত্মদেবী ।
এই আত্মদেব বা আত্মদেবীর নাম সম্বন্ধে শাস্র বলিতেছেনঃ-
গীতা নামানি বক্ষ্যামি গুহ্যানি শৃণু পাণ্ডব ।
কীর্ত্তনাৎ সর্ব্বপাপানি বিলয়ং যান্তি তৎক্ষনাৎ ।।
গঙ্গা গীতা চ সাবিত্রী সীতা সত্যা পতিব্রতা ।
ব্রক্ষাবলির্ব্রক্ষবিদ্যা ত্রিসন্ধ্যা মুক্তিগেহিনী ।।
অর্দ্ধমাত্রা চিদানন্দা ভবঘ্নী ভ্রান্তিনাশিনী ।
বেদত্রয়ী পরানন্দা তত্ত্বার্থজ্ঞান্মঞ্জরী ।।
ইত্যেতানি জপন্নিত্যাং নরো নিশ্চল-মানসঃ ।
জ্ঞানসিদ্ধিং লভেন্নিত্যং তথাহস্তে পরমং পদম্‌ ।।
হে অর্জ্জুন ! গীতার গুহ্য নাম সকল আমি বলিতেছি শ্রবণ কর । এই নাম সকল কীর্ত্তন করিলে পাপরাশি তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট হয় ।
গঙ্গা, গীতা, সাবিত্রী, সীতা, সত্যা, পতিব্রতা, ব্রক্ষাবলি, ব্রক্ষবিদ্যা, ত্রিসন্ধ্যা, মুক্তিগেহিণী, অর্দ্ধমাত্রা, চিদানন্দা, ভবঘ্নী, ভ্রানিনাশিনী, বেদত্রয়ী, পরানন্দা, তত্ত্বার্থজ্ঞানমঞ্জরী ইত্যাদি নাম যিনি নিশ্চল-চিত্তে নিত্য জপ করেন, তিনি সর্ব্বদার জন্য জ্ঞানসিদ্ধি লাভ করেন, এবং অন্তে পরম শান্ত নিশ্চল আনন্দস্বরুপ বিশ্বতৈজসপ্রাজ্ঞ এই ত্রিপাদের উর্দ্ধে যে পরম পদ তাহাতে প্রবিষ্ট হইয়া স্থিতিলাভ করেন ।
সর্ব্বজ্ঞান-প্রয়োজিকা ধর্ম্মময়ী শ্রীগীতাকে শ্রীভগবান্‌ বলিতেছেনঃ-
গীতা মে হৃদয়ং পার্থ ! গীতা মে সারমুত্তমম্‌ ।
গীতা মে জ্ঞানমত্যুগ্রং গীতা মে জ্ঞানমব্যয়ম্‌ ।।
গীতা মে চোত্তমস্থানং গীতা মে পরমং পদম্‌ ।
গীতা মে পরমং গুহং গীতা মে পরমো গুরুঃ ।।
শ্রীভগবান্‌ বলিতেছেন- গীতাই আমার হৃদয়, গীতাই আমার উত্তম সার, গীতাই আমার অত্যুগ্র অব্যয়-জ্ঞান, গীতাই আমার রমণীয় বাসভবন, গীতাই আমার পরম পদ । অধিক কি গীতাই আমার পরম গুহ্য ; গীতাই আমার পরম গুরু ।
শ্রীভগবানের পরম গুরু যিনি তাঁহাকেও চৈতিন্যময়ী বলিতে কি আপত্তি হইতে পারে ?
শেষ কথা । "কৃষ্ণো জানাতি বৈ সম্যক্‌ কিঞ্চিৎ কুন্তীসুতঃ ফলম্‌ । ব্যাসো বা ব্যাসপুত্রো বা যাজ্ঞবল্ক্যোহথ মৈথিলঃ ।।" ঃ-যাঁহার সম্বন্ধে বলা হয় কৃষ্ণই সম্যক্‌ জানেন, অর্জ্জুন কিঞ্চিৎ ফল অবগত, ব্যাসদেব বা শুকদেব বা যোগী যাজ্ঞবল্ক্য বা জনক কিঞ্চিৎমাত্র জানেন, তাঁহার সম্বন্ধে অকিঞ্চন এই ছার জীবে কি জানিবে ? তথাপি কোন্‌ সঙ্কারবশে এই অসাধ্যসাধনও ছাড়িতে দাও না, তাহা বুঝিব কিরুপে ? জীব কি আপন ইচ্ছায় এইরূপ কার্য্য করে, অথবা তোমর ইচ্ছায় চালিত হইয়া এইরূপ কার্য্যে প্রবৃত্ত হয় তাহা কে বুঝাইয়া দিবে ? অথবা বুঝিবারই প্রয়োজন কি ?
হে অগতির গতি ! যে দিক্‌ দিয়াই লইয়া যাও, হে আত্মদেব ! আমাদের এই কর, যেন সকল কার্য্যে মানুষ তোমার অনুগ্রহ কামনা ভিন্ন অন্য কামনা না করে, যেন সমস্ত ফলকামনা ত্যাগ করিয়া, তোমার আজ্ঞা পালন করিতে করিতে তোমার আশ্রয়ে নিরন্তর থাকিতে পারে । জনন মরণে তুমি মাত্র আশ্রয় দাতা । হে অধমজনের ত্রানকর্ত্তা ! হে পতিতপাবন ! হে পাপীতাপীর আশ্রয় ! হে ক্ষমাসার ! হে আমার দেবতা, হে আমার প্রভু ! কি আর বলিব, প্রার্থনা করিতেও জানি না । তথাপি এই বলি, ভৃঙ্গ যেমন কমল মধ্যে ডুবিয়া থাকিলে আরাম পায়-তাপত্রিতয়-জ্বালামালাকুল আমরা যেন সর্ব্বদা এই জ্বালা অনুভব করিয়া, কাতর হইয়া তোমাকে ডাকিতে ডাকিতে, তোমার পরমপদে, তোমার মধুর চরণকমলে, চিরস্থিত লাভ করিতে পারি । হে অব্যক্ত-স্বরুপ ! হে বিশ্বরুপ ! হে স্বেচ্ছাধৃত-বিগ্রহ ! তোমার এই ত্রিবিধ রূপ দর্শন করিব, এই উৎকন্ঠাস্ফুটিত চিত্তে যেন নিরন্তর তোমাকে স্মরণ করিয়া কৃতার্থ হইতে পারি, প্রভু ইহাই প্রার্থনা ।
  ***************************

Tuesday, March 5, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-২

 * প্রথম কথা *
  -গীতার আদর -পর্ব-২


ধারাবাহিকভাবে  প্রচারিত ............পর্ব-২
শ্রীগীতা রঙ্গময়ী । জগৎস্বরুপিণী বিশ্বনর্ত্তকী মায়ার অনুসরণ করা যেমন কঠিন, শ্রীগীতার অনুসরণ করাও যেন সেইরূপ দুরূহ । ভদ্রার সারথ্য-নৈপুণ্যে অর্জ্জুনের রথগতির মত, এই বিশ্বনর্ত্তকী, কথন জনমন্ডুলীর চতুর্দ্দিকে নৃত্য করেন, পরক্ষণেই অদৃশ্য হইয়া যান; মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের খেলার মত কখন ইনি শূন্যে চমকাইতেছেন, কখন মেঘ মধ্যে লুক্কাইত হইতেছেন, সুদীর্ঘ জলাশয়ে বৃহৎ মৎস্যের মত কখন নিকটের জল আলোড়িত করিতেছেন, পরক্ষণেই আবার দূরে চলিয়া গিয়াছেন; কখন মনে হইল বুঝি ধরিলাম, পরক্ষণেই কোথায় চলিয়া গেল- শ্রীগীতার পশ্চাদ্ধাবন যেন এইরূপ বিস্ময়কর ।
জগৎস্বরুপিণী মায়ার চাঞ্চল্যাভ্যন্তরে যেমন স্থির শান্ত রমণীয় দর্শন বিরাজ করেন, শ্রীগীতাবস্ত্রান্তর্ব্যাঞ্জিত-স্তনী উপনিষদ্‌ দেবীও যেন এই খানে সেইরুপ অবস্থান করিতেছেন । অধিক কি বলা যাইবে, মহাকাশ, চিত্তাকাশ ও চিদাকাশ ছাইয়া শ্রীগীতার রূপরাশি ত্রিজগৎ চমৎকৃত করিতেছে ।
যিনি সমকালে স্থুল, সুক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর, সূক্ষ্মতম, যিনি সমকালে পরমাশ্চর্য্যারুপধারিনী মায়ামানুষী, সর্ব্বনরনারীবিজড়িত সর্ব্বস্থাবরজঙ্গমসন্মিলিত বিশ্বরুপিণী, আবার আপন সৃষ্টি আপনি বিনাশ করিয়া, দৃশ্যগরল আপনি নিঃশেষ পান করিয়া, দৃশ্য-প্রপঞ্চ আপন আত্মায় নিঃশেষ পরিপাক করিয়া, যিনি আপনাতে আপনি,-তাহার সমগ্ররুপ দর্শন যে আমাদের মত ক্ষীণপুণ্য, সাধনকাতর দুর্ব্বল জীবের পক্ষে সুদুরপরাহত, ইহা কি আর বিশেষ করিয়া বলিতে হইবে ?
গীতা অধ্যয়ন এক জীবনের কেন, যতদিন না জীবন্মুক্তি লাভ না হয়, যেন তত জীবনের কার্য্যা । জীবন্মুক্তি না হওয়া পর্য্যন্ত বুঝি ইহার ভাব-ইহার স্থায়ীভাব-জীব-চৈতন্য বিন্দুকে, ব্রক্ষ-চৈতন্য সিন্ধুতে মগ্ন করিয়া রাখে না ।
মনে হয় দ্বিতীয় বারের আলোচনায় শ্রীগীতা বুঝিতে বুঝি পারা যায় না ।
যদি কাহারও শরণাপন্ন হওয়া যায়, তবে আশ্রিতকে আশ্রয়দাতার ইচ্ছা অনুসারে চলিতে হয় ; নতুবা আশ্রয় গ্রহণটা মৌখিক । যদি শ্রীগীতার আশ্রয় লইতে হয়, তবে শ্রীগীতার অভিপ্রায় অনুসারে কার্য্য করাই কর্ত্তব্য । শ্রীভগবানের অনুগ্রহ অনুভব করিতে হইলেও, তাঁহার আজ্ঞামত কার্য্য করা কর্ত্তব্য ।
কোথাও তাঁহার আজ্ঞা পাওয়া যাইবে যদি জিজ্ঞাসা করা যায়। তবে বলিতে হয়, বেদে পাওয়া যায় ; আধ্যাত্মশাস্রমাত্রেই পাওয়া যায় । গীতার মত গ্রন্থে বিশেষরূপে পাওয়া যায় ।
গীতা-শাস্র হইতে শ্রীভগবানের আজ্ঞাগুলি বাছিয়া লইয়া যিনি যেটি পালন করিতে পারেন তজ্জন্য প্রাণপণ করুন ; শ্রীগীতার অনুগ্রহ যে বুঝিতে পারিবেন এ বিষয়ে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নাই ।
চলবে.............

Monday, March 4, 2013

শ্রীমদ্ভাগবদগীতা পরিচয় -পৃষ্ঠা নং-১

 প্রথম কথা
গীতার আদর- পর্ব-০১


ধারাবাহিক ভাবে প্রচারিতঃ- ১
শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতার আদর আজ জগত জুড়িয়া । সমস্ত সভ্য ভাষায় গীতা অনুদিত । এই গীতার মাহাত্ম্য সম্বন্ধেঃ-
শ্রীভগবান বলিয়াছেন-" যে যথ মাং প্রপদ্যন্তে তাং স্তথৈব ভজাম্যহ্‌ম" যাহারা যে প্রয়োজনে আমাকে আশ্রয় করে, তাঁহাদিগকে সেই ফলদানেই আমি অনুগ্রহ করি ।
স্বাধ্যায়সম্পন্ন সাধক যেমন যেমন শ্রীভগবানের আজ্ঞাপালনরুপ সাধনা দ্বারা এই বেদত্রয়ী তত্ত্বার্থজ্ঞানমঞ্জুরী মুক্তিগেহিনীর আশ্রয়ে আগমন করেন, তিনি ততই যেন ইহার অনুভব করেন ।
শ্রীগীতা একবার অধ্যয়ন কর, মনে হইবে যেন ইহাতে কত কি আছে, যেন কত কি ইনি দেখাইবেন আশ্বাদ দিতেছেন; আবার পড়ি, নূতন সৌন্দর্য্য উদ্‌ঘাটিত হইল ;আরও পড়ি, আরও রমণীয় ; মনে হয় যেন ইহার শেষ নাই ।
শ্রীগীতা ব্রক্ষস্বরুপিণী । শ্রীগীতা জ্ঞানময়ী । আর্ত্ত, জিজ্ঞাসু, অর্থার্থী ও জ্ঞানী এই চারিপ্রকার ভক্তের যে কোন ভক্ত যে ভাবে ইহার ভজনা করেন, ইনি সেই ভাবের মধ্য দিয়াই যেন ইহার আশ্রিতকে-এই কোলাহলময় জগতের অন্তঃস্থলে যে রমণীয় নিস্তব্ধ ভাবজগৎ আছে, প্রতি গতির অভ্যন্তরে যে এক পরমশান্ত স্থিতি আছে-ধীরে ধীরে শত সৌন্দর্য্য দেখাইতে দেখাইতে সেই স্থানে লইয়া যান ।
শ্রীগীতা আনন্দময়ী । সাধনা দ্বারা ব্যাকুল হইয়া যে কেহ ইহার রূপ দেখিতে উৎকন্ঠাস্ফুটিত চিত্ত হয়েন, ইনি ইহার আশ্রিতকে আপনার স্থুল স্থুল আবরণ উন্মোচন করিয়া, ধীরে ধীরে, ক্রমে ক্রমে, আপনার যথার্থ স্বরূপ যে সেই রমণীয় দর্শন, তাঁহাকেই দেখাইয়া দিয়া থাকেন ।
                                                                                                                                চলবে.............
জয় গুরু , এই ব্লগ পেইজে সকলকে আমার প্রণাম, আমি শ্রীমান কৃষ্ণকমল আপনাদের সকলকে আমার  Theory of self knowledge and  advice.আত্মতত্ত্ব জ্ঞান উপদেশ ।  সকলকে আমন্ত্রণ জানাই