* প্রথম কথা *
-গীতার আদর - পর্ব-৩
-গীতার আদর - পর্ব-৩
ধারাবাহিক ভাবে প্রচারিত ............পর্ব-৩
গীতাগ্রন্থকে মানুষের মত জীবন্ত মনে করিয়া সম্বোধন করা হইয়াছে । অনেকে মনে ভাবিতে পারেন ইহা কি প্রকার ভক্তি ? পুস্তুক আবার মানুষের মত কিরুপে হইবে ? আবার কেহ কেহ ইহা সত্যও ভাবিতে পারেন । "গীতা মে হৃদয়ং পার্থ" । যাহা শ্রীভগবানের হৃদয় তাহা জড় বলিয়া নাই ভাব হইল-ইহাতে কি কিছু অতিরঞ্জিত আছে ? মানুষের হস্ত পদ চক্ষু কর্ণাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জড়; এই গুলিকে মানুষ বলা হয় না । স্থুল আবরণগুলিকে জীবন্ত করিয়া যে চৈতন্য পুরুষ বিরাজিত, তিনিই মানুষ ।
জড় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবলম্বন করিয়াই তিনি প্রকাশ পাইয়া থাকেন । গীতাগ্রন্থের অক্ষরগুলিকে শব্দমাত্র বলা হইলেও সেই শব্দরাশির অর্থ দ্বারা যে আত্মদেব প্রকাশিত তিনিই শ্রীগীতা । ইনিই সমকালে অক্ষর বা অব্যক্ত বা নির্গুণ ব্রক্ষ, ইনিই সগুণ ব্রক্ষ বা বিশ্বরুপ, ইনিই মায়ামানুষ বা মায়া-মানুষী, ইনিই প্রতি জীবের আত্মা । জড় আবরণটি মায়া, ভিতরের হৃদয়টিই আত্মদেব বা আত্মদেবী ।
এই আত্মদেব বা আত্মদেবীর নাম সম্বন্ধে শাস্র বলিতেছেনঃ-
গীতা নামানি বক্ষ্যামি গুহ্যানি শৃণু পাণ্ডব ।
কীর্ত্তনাৎ সর্ব্বপাপানি বিলয়ং যান্তি তৎক্ষনাৎ ।।
গঙ্গা গীতা চ সাবিত্রী সীতা সত্যা পতিব্রতা ।
ব্রক্ষাবলির্ব্রক্ষবিদ্যা ত্রিসন্ধ্যা মুক্তিগেহিনী ।।
অর্দ্ধমাত্রা চিদানন্দা ভবঘ্নী ভ্রান্তিনাশিনী ।
বেদত্রয়ী পরানন্দা তত্ত্বার্থজ্ঞান্মঞ্জরী ।।
ইত্যেতানি জপন্নিত্যাং নরো নিশ্চল-মানসঃ ।
জ্ঞানসিদ্ধিং লভেন্নিত্যং তথাহস্তে পরমং পদম্ ।।
হে অর্জ্জুন ! গীতার গুহ্য নাম সকল আমি বলিতেছি শ্রবণ কর । এই নাম সকল কীর্ত্তন করিলে পাপরাশি তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট হয় ।
গঙ্গা, গীতা, সাবিত্রী, সীতা, সত্যা, পতিব্রতা, ব্রক্ষাবলি, ব্রক্ষবিদ্যা, ত্রিসন্ধ্যা, মুক্তিগেহিণী, অর্দ্ধমাত্রা, চিদানন্দা, ভবঘ্নী, ভ্রানিনাশিনী, বেদত্রয়ী, পরানন্দা, তত্ত্বার্থজ্ঞানমঞ্জরী ইত্যাদি নাম যিনি নিশ্চল-চিত্তে নিত্য জপ করেন, তিনি সর্ব্বদার জন্য জ্ঞানসিদ্ধি লাভ করেন, এবং অন্তে পরম শান্ত নিশ্চল আনন্দস্বরুপ বিশ্বতৈজসপ্রাজ্ঞ এই ত্রিপাদের উর্দ্ধে যে পরম পদ তাহাতে প্রবিষ্ট হইয়া স্থিতিলাভ করেন ।
সর্ব্বজ্ঞান-প্রয়োজিকা ধর্ম্মময়ী শ্রীগীতাকে শ্রীভগবান্ বলিতেছেনঃ-
গীতা মে হৃদয়ং পার্থ ! গীতা মে সারমুত্তমম্ ।
গীতা মে জ্ঞানমত্যুগ্রং গীতা মে জ্ঞানমব্যয়ম্ ।।
গীতা মে চোত্তমস্থানং গীতা মে পরমং পদম্ ।
গীতা মে পরমং গুহং গীতা মে পরমো গুরুঃ ।।
শ্রীভগবান্ বলিতেছেন- গীতাই আমার হৃদয়, গীতাই আমার উত্তম সার, গীতাই আমার অত্যুগ্র অব্যয়-জ্ঞান, গীতাই আমার রমণীয় বাসভবন, গীতাই আমার পরম পদ । অধিক কি গীতাই আমার পরম গুহ্য ; গীতাই আমার পরম গুরু ।
শ্রীভগবানের পরম গুরু যিনি তাঁহাকেও চৈতিন্যময়ী বলিতে কি আপত্তি হইতে পারে ?
শেষ কথা । "কৃষ্ণো জানাতি বৈ সম্যক্ কিঞ্চিৎ কুন্তীসুতঃ ফলম্ । ব্যাসো বা ব্যাসপুত্রো বা যাজ্ঞবল্ক্যোহথ মৈথিলঃ ।।" ঃ-যাঁহার সম্বন্ধে বলা হয় কৃষ্ণই সম্যক্ জানেন, অর্জ্জুন কিঞ্চিৎ ফল অবগত, ব্যাসদেব বা শুকদেব বা যোগী যাজ্ঞবল্ক্য বা জনক কিঞ্চিৎমাত্র জানেন, তাঁহার সম্বন্ধে অকিঞ্চন এই ছার জীবে কি জানিবে ? তথাপি কোন্ সঙ্কারবশে এই অসাধ্যসাধনও ছাড়িতে দাও না, তাহা বুঝিব কিরুপে ? জীব কি আপন ইচ্ছায় এইরূপ কার্য্য করে, অথবা তোমর ইচ্ছায় চালিত হইয়া এইরূপ কার্য্যে প্রবৃত্ত হয় তাহা কে বুঝাইয়া দিবে ? অথবা বুঝিবারই প্রয়োজন কি ?
হে অগতির গতি ! যে দিক্ দিয়াই লইয়া যাও, হে আত্মদেব ! আমাদের এই কর, যেন সকল কার্য্যে মানুষ তোমার অনুগ্রহ কামনা ভিন্ন অন্য কামনা না করে, যেন সমস্ত ফলকামনা ত্যাগ করিয়া, তোমার আজ্ঞা পালন করিতে করিতে তোমার আশ্রয়ে নিরন্তর থাকিতে পারে । জনন মরণে তুমি মাত্র আশ্রয় দাতা । হে অধমজনের ত্রানকর্ত্তা ! হে পতিতপাবন ! হে পাপীতাপীর আশ্রয় ! হে ক্ষমাসার ! হে আমার দেবতা, হে আমার প্রভু ! কি আর বলিব, প্রার্থনা করিতেও জানি না । তথাপি এই বলি, ভৃঙ্গ যেমন কমল মধ্যে ডুবিয়া থাকিলে আরাম পায়-তাপত্রিতয়-জ্বালামালাকুল আমরা যেন সর্ব্বদা এই জ্বালা অনুভব করিয়া, কাতর হইয়া তোমাকে ডাকিতে ডাকিতে, তোমার পরমপদে, তোমার মধুর চরণকমলে, চিরস্থিত লাভ করিতে পারি । হে অব্যক্ত-স্বরুপ ! হে বিশ্বরুপ ! হে স্বেচ্ছাধৃত-বিগ্রহ ! তোমার এই ত্রিবিধ রূপ দর্শন করিব, এই উৎকন্ঠাস্ফুটিত চিত্তে যেন নিরন্তর তোমাকে স্মরণ করিয়া কৃতার্থ হইতে পারি, প্রভু ইহাই প্রার্থনা ।
***************************

No comments:
Post a Comment