* দ্বিতীয় কথা *
গীতার স্থান, কাল ও পাত্র পর্ব-৫।
ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত ............।।
দেখিতে দেখিতে রথ উভয়সেনার মধ্যস্থলে আনীত হইল । অর্জ্জুন দেখিতেছেন-আত্মীয়, স্বজন, পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, সখা, শ্বশুর-সকলেই যুদ্ধার্থ সমবেত । সহসা মনের গতি পরিবর্ত্তিত হিল-ক্রোধ দূরে গেল, আসিল নির্ব্বেদ । এই অর্জ্জুন-চরিত্রে আমাদের প্রয়োজন । সত্যকথা, অর্জ্জুনের মত শাস্র-মর্য্যাদা অর্জ্জুনের মত গুরুমর্য্যাদা, অর্জ্জুনের মত লক-মর্য্যাদা আর আমরা দেখিতে পাই না । তথাপি যখন দেখি, এই মহান্ চরিত্র প্রবল উৎসাহে কর্ম্মক্ষেত্রে উপস্থিত হইয়া কর্ত্তব্যের নিষ্ঠুরতা অনুভব করিয়া আমাদের মত চিত্তের দুর্ব্বলতা দেখাইতেছেন, যখন দেখি কর্ত্তব্যের গুরুভারে নিষ্পেষিত হিয়া-শোক-মোহাচ্ছন্ন হইলে আমাদের যাহা হয়-অর্জ্জুনের তাহাই হইতেছে, তখন অর্জ্জুনকে আমাদের মত ভাবিয়া অর্জ্জুনের সহিত সহানুভুতির দেখাইতে আমরা প্রস্তুত হই । বড় ব্যগ্র হইয়া শুনিতে চাই, অর্জ্জুন কি বলিতেছেন ? অর্জ্জুন বলিতেছেন-
দৃষ্ট্বেমান্ স্বজনান্ কৃষ্ণ যুযুৎসূন্ সম্বস্থিতান্ ।
স্ব্বদস্তি মমগাত্রাণি মুখঞ্চ পরিশুষ্যতি ।।
বেপথুশ্চ শরীরে মে রোমহর্ষশ্চ জায়তে ।
গাণ্ডীবং স্রংসতে হস্তাৎ ত্বক্ চৈব পরিদহ্যতে ।।
বলিতেছেন-হে কৃষ্ণ ! হে কেশব ! এই সমস্ত স্বজনকে যুদ্ধ করিতে আসিতে দেখিয়া আমার অঙ্গ অবসন্ন হইতেছে, শরীর কম্পিত হইতেছে, রোমহর্ষ হইতেছে, হস্ত হইতে গাণ্ডীব স্থলিত হইতেছে এবং ত্বক্ দগ্ধ হইয়া যাইতেছে । আমি আর অবস্থান করিতে পারিতেছি না, আমার মন বিঘুর্ণিত হইতেছে, নানাপ্রকার অমঙ্গল দেখিতেছি-অর্জ্জুনের বিষাদ-শান্তির জন্য ভগবান্ ব্রাক্ষীস্থিতি উপদেশ প্রদান করিলেন । ভগবান শঙ্কর ব্রাক্ষীস্থিতি অর্থে বলিতেছেন-"ব্রক্ষণি ভবেয়ং স্থিতিঃ, সর্ব্বকর্ম্ম সংন্যস্য ব্রক্ষরুপেণৈবাবস্থামিত্যেতৎ" অর্থাৎ সর্ব্বকর্ম্ম সন্ন্যাস্পুর্ব্বক ব্রক্ষরূপে অবস্থানের নাম ব্রাক্ষীস্থিতি । ব্রাক্ষীস্থিতি, ব্রক্ষনির্ব্বাণ, আত্মজ্ঞান ইত্যাদি একই কথা । ব্রাক্ষীস্থিতি ভিন্ন শোকের চিরনিবৃত্তি হইতে পারে না । অন্য অন্য উপায়ে শোক দুঃখের ক্ষণিক নিবৃত্তি হইতে পারে সত্য, কিন্তু ক্ষণিক-নিবৃত্তি জন্য বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি ব্যাকুল নহেন । কারণ গুরুকর্ত্তব্যপালনে লঘুকর্ত্তব্যের সুখ অবশ্যই লাভ হয় । আত্যন্তিক একমাত্র প্রয়োজন । সাংখ্য-শাস্রে এই আত্যন্তিক নিবৃত্তিই লক্ষ্য, যোগশাস্রে এই আত্যন্তিক নিবৃত্তির উপায়-চিত্তবৃত্তি নিরোধ-করিয়া দ্রষ্টার স্বরুপে অবস্থান; বেদান্ত ইহারই জন্য ব্রক্ষ-জিজ্ঞাসা । গীতা দ্বিতীয় অধ্যায়ে ব্রাক্ষীস্থিতির স্বরুপ বুঝাইয়াছেন এবং বাকী অধ্যায়গুলি এই স্থিতি কিরুপে লাভ হইবে, তজ্জন্য সাধনার ক্রম দেখাইয়াছেন । আমরা অতিসংক্ষেপে গীতোক্ত ব্রাক্ষীস্তিতি বা মুক্তির আলোচনা করিব । গীতার প্রথম অধ্যায়ে বিষাদ-যোগ, শেষ-অধ্যায়ে মোক্ষ যোগ ।
No comments:
Post a Comment